গল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

প্রমত্তা

হঠাৎ করেই ওর সাথে আমার বন্ধুত্বটা বাড়তে থাকে। এমন একটা সময়ে আমি ওর প্রতি তীব্র প্রেম অনুভব করি যখন আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক মাঝামাঝি ধরণের। এরকম সম্পর্ক নাকি দীর্ঘদিন টিকে থাকে, ভেঙে যায় দুর্বল আর কঠিন সম্পর্কগুলো। একদিকে যদিও এইটা আশার আলো কিন্তু সেই সময় আমি ধরে নিয়েছিলাম আমাদের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক।
সে যাই হোক। আমি তাকে বলবো ভেবেছিলাম। কিন্তু একটা ব্যাপার সবসময় মনের মধ্যে ঘুরতো, বলতে বাধা দিত-- সে যদি রাজি না থাকে? তবে তো বন্ধুত্বটা আর থাকবে না।
আমি ওকে বলিনি কখনো। কিন্তু মেয়েরা না অনেক কিছু বোঝে? ও কেন বুঝলো না? নাকি সে বুঝেছিল এবং অপেক্ষা করছিল? অথবা সে চায় নি নতুন সম্পর্ক।
আমি প্রায়ই ওর কথা ভাবি। আর খাটের পিছন থেকে একটা গান বাজতে থাকে,--

"... অন্ধকার ঘরে, কাগজের টুকরো ছিঁড়ে, কেটে যায় আমার সময় ..."

আমি এক ঘন কালবৈশাখীতে ওকে ডেকেছিলাম রেস্তোরাতে। সে অধীর আগ্রহে আমার কথা শুনবে বলে এসেছিল। আমি সেদিনও বলিনি শুধু মৃদু সুরে ভেসে আসা 'Gun N' Roses' এর নভেম্বর রেইনে ভিজেছি।

এখন আষাঢ় মাস, ও হয়তো বৃষ্টিতে ভিজছে, অথবা ...
আমি ঠিক জানি না। শুধু বুঝতে পারছি, দূর থেকে একটা সুর ভেসে আসছে, আমি গভীর ঘুমে নিমজ্জিত হচ্ছি, সুর তা পরিচিত লাগছে, কিন্তু মনে আসছে না, মস্তিষ্ককে গ্রাস করছে ফ্রিজিয়াম।
আমি নিদ্রিত কিন্তু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি,--

" ... পিঞ্জর খুলে দিয়েছি, যা কিছু কথা ছিল ভুলে গিয়েছি,
যা রে যাবি যদি যা, যা রে যাবি যদি যা ... "

[[কিংশুক২০১৭জুন১৭শাহজাহানপুর,ঢাকা১৪৪৮]]

আমি ও কারতেস

ঢাকার রাস্তায় মানুষ হারায় না সহজে।
কিন্তু আমি হারিয়ে গেলাম।
রাত মোটামুটি সাড়ে দুইটা(!)। নির্জন ঢাকার রাজপথ। 
মাঝে মাঝে কিছু কুকুর ঘেউ ঘেউ করে দৌড়াদৌড়ি করছে। 
আমার বাসায় যাওয়া দরকার কারন প্রকৃতি ঢাকছে(  ) 

একটা কুকুর কে ডেকে জিজ্ঞাস করলাম, "এই যে কুত্তা ভাই, একটু শুনেন ... "
কুকুর আমার কাছে এসে বললো,"কোনো প্রব্লেম ব্রাদার? ছিন্তাই করেছে কেউ? "
- আরে না। চেপেছে! মালিবাগের রাস্তাটা কোন দিকে বললে ভাল হয়, বাসায় যাব।
- কা'মন ব্রো, এটা কি বললেন, রাস্তা বের করতে পারছেন না? আপনি এখন y=m1x1+c1 অ্যান্ড y=m2x2+c2 এর intersecting point এ আছেন। X axis থেকে ϴ কোণে a মিটার গেলে একটা triangle এর center of gravity পাবেন। সেখান থেকে দেখবেন D,F,G,H,J points গুলোর মধ্যে ৩টা point আছে co-linear. সেই straight line বরাবর হাঁটবেন দেখবেন মালিবাগ এ পৌঁছে গেছেন।
- (Ⓧ_Ⓧ)


[[কিংশুক২০১৬জানুয়ারি২০শান্তিবাগ০৩৩০]] 

ভ্রমরা তুমি উড়িয়া বসেছো কোন ফুলে

আমার বারান্দা থেকে খুব ভালো সূর্যাস্ত দেখা যায়। 
সময় পেলেই আমি আমি পড়ন্ত বিকেলে চলে আসি আমার বারান্দায়। গভির মনোযোগে সূর্যাস্ত দেখি।

প্রচণ্ড গরম পরেছিল আজকে। আর আমাকে পেয়ে বসেছিল হিমেল হাওয়ায় প্রাণ জুড়ানোর নেশায়। 

গোধূলির কমলা আভা মিইয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। আমি অপেক্ষা করছি অন্ধকারের। যেই অন্ধকারে আমায় কেউ দেখে না। যে অন্ধকার কেউ চায় না। 
...
আধার নেমেছে, তার সাথে উচ্ছৃঙ্খল শীতল বাতাস। প্রকান্ড গর্জন আকাশের। তারপর? তারপর সব শান্ত। আমার মত আজ প্রকৃতিও সর্বশান্ত। সেও আজ কেঁদে উঠতে চায় হারাবার বেদনায়।
বৃষ্টি হচ্ছে। আর হাড় কাপানো কনকনে শীতল বাতাস। একটা পাতলা চাদর গায়ে জড়িয়ে আমি নেমে পরেছি রাস্তায়। 
...
এরকম এক বৃষ্টিময় সন্ধ্যায় সে আমায় ডেকেছিল বৃষ্টি-বিলাসে। দেখিয়েছিল বরষার প্রেম। শুনিয়েছিল রুমঝুম রুমঝুম বৃষ্টির কবিতা। সে সেদিন আমায় শিখিয়েছে জলের প্রনয়।

আমি হেটে যাচ্ছি ভেজা শহরের বুকে। সেই জায়গায়। যেখানে সে নেচেছিল বারিধারায়। এখনো বৃষ্টি হচ্ছে। আমি বসেছি সেই চেনা মোজাইকের বেঞ্চটাতে। সামনে কিছুটা দূরে আসমানি শাড়ি পড়া একজন সুদর্শনা তার সাথের মানুষটাকে পরম মমতায় বৃষ্টি দেখাচ্ছে। আজ তার পালা বৃষ্টি বিলাসের।
হঠাৎ হর্ণ বাজাতে বাজাতে একটা প্রাইভেট কার ছুটে গেলো পাশের রাস্তা দিয়ে। কিছুক্ষণের জন্য আসমানি শাড়ি পড়া মেয়েটির মুখ স্পষ্ট হয়েছিল আমার সামনে। 
তারপর অন্ধকার। মেয়েটি ছেলেটাকে শিখিয়ে যাচ্ছে। আমি পাথরের মত তাকিয়ে আছি সেদিকে। আলোআঁধারির এই খেলা না হলেই বোধয় ভালো হত; হয়তো তখন আমার গালে শুদ্ধ জল আর নোনা জলের ধারা এক হত না।
...
পৃথিবীর সব খেলা একই থাকে সব সময় শুধু বদলে যায় খেলোয়ার। পাশার দান শুধু বদলায়, কোটটা ঠিক আগের মতই।

[[কিংশুক২০১৬মে০২শান্তিবাগ,ঢাকা০২৩৬]]

রুপকথা

চলুন একটা রূপকথার গল্প শুনি

এক দেশে ছিল এক রাজা যে সেই রাজা নয় মহারাজা তার ছিল অসম্ভব সুন্দরী রানি রাজা রানির মধ্যে ছিল বেজায় ভাব অসহ্য ভালবাসা ছিল তাদের মধ্যে সুখের রাজ্য দেশে কোনো অশান্তি ছিল না ঘরে ঘরে ছিল সুখের শোভা রাজ্যের প্রতিটি প্রাণীই রাজাকে সম্মান করত রাজাকে পছন্দ করত পাশের কোনো রাজ্যের সাথে মহারাজের কোনো বিরোধ ছিল না সবাই বন্ধু দেশ
রানি ছিল পাশের রাজ্যের রাজকন্যা সেই রাজ্য একদিন ভিন্ন রাজ্যের খারাপ যুদ্ধবাজ রাজার কুনজরে পরল আক্রমণের দৃঢ়তায় প্রতিহত হল রানির বাবার রাজ্য বন্দী হলেন সবাই বদ রাজাটা গুনে গুনে সবাইকে কারারুদ্ধ করল শুধু দেখতে পেল না বড় রাজকন্যা কে কি করে দেখবে? বড় রাজকন্যা যে মহারাজ ফাহাদ এর মহারানী
তাই তারা মহারাজ ফাহাদের রাজ্য আক্রমণ চালালো শুধু মহারানী কে ধরে নিয়ে যাবে বলে অনেক যুদ্ধ হল যুদ্ধে মহারাজের অনেক সৈন্য মারা গেল রাজকোষ বিপর্যিত হল তারা মহারাজা কে ধরে ফেললো
মহারাজ কে ঘিরে আক্রমণকারী রা দাঁড়াল মহারানীর কথা জিজ্ঞাস করল মহারাজা বলল প্রাণ থাকতে তারা মহারানীর নখের দিশাও পাবে না তারা বলল তাহলে মহারাজকে হত্যা করবে এই কথা শুনে মহারাজ উচ্চস্বরে হা হা হা করে হাসতে লাগল তারা মহারাজ কে হাসির কারণ জিজ্ঞাসা করলে মহারাজ বলল যে মহারাজ ফাহাদ কে হত্যা করার সাথে সাথে মহারানীও মারা যাবে কারণ তাদের জীবন এঁকে অন্যের সাথে যুগলবন্দী তাই মহারানী কে পেতে হলে মহারাজাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে
তারা মহারাজা কে হত্যা করল না ঠিকই কিন্তু তাকে রাজ্য বন্দী করল সব বন্ধু রাজ্য নিজেদের স্বার্থের জন্য মহারাজা ফাহাদ কে সাহায্য করা থেকে বিরত থাকল মহারাজা চিন্তায় পরে গেল তার মেজাজ আস্তে আস্তে খিট খিটে হতে শুরু করল কারও সাথেই ঠিক মত কথা বলে না রাজ কার্যে তেমন মন নেই এমন কি মহারানীর সাথেও ঠিক মত কথা বলে না মহারানী অন্দরমহলে থেকে এই যুদ্ধবিগ্রহ কোনো কিছুই জানত না এদিকে মহারাজা মহারানীর বাবার রাজ্য এবং পরিবার নিয়ে চিন্তিত কি করে তাদের রক্ষে করা যায় এই নিয়ে ব্যস্ত
একদিন মহারানী এসে মহারাজের সাথে গল্প জুড়ে দিল না না কথা বলছিল মহারাজার মেজাজ এমনিতেই ভাল ছিল না কারণ শ্বশুর এর রাজ্য মুক্ত করার কোনো কৌশলই বের করতে পারছিল না সে তাই মহারাজা মহারানী কে বলেছিল ভিতরে চলে যেতে কিন্তু মহারানী চাচ্ছিল মহারাজার কাছে থাকতে একপর্যায়ে মহারাজা জোরপূর্বক মহারানীকে ভেতরে পাঠিয়ে দেয়
ফলাফল, মহারানী তার মহারাজার উপর বেজায় রেগে আছেন তার রাগ ভাঙ্গানোর কোনো উপায় রাজা খুঁজে বের করতে পারছে না তাই সে একটি চিঠি লিখল মহারানীর কাছে

    প্রিয় মহারানী,

    সারা দিন যাহাই করি না কেন গোধূলি লগ্নের পর আমাকে ফিরিয়া                আসিতে হইবে তোমারই নিকটে কারণ আমি যে তোমায় ছাড়া কিছুই          নই
    তাই আমাকে প্রত্যাখ্যান কর না গ্রহণ করিয়া লও মোর ভালবাসা
    
    ইতি মহারাজা

চিঠি খানা পেয়ে মহারানীর মন গলে গেল তার রাগ ভাঙল
অতঃপর দুজন মিলে সব সমস্যার অবসান ঘটাল এবং ধরায় নেমে এলো শান্তির স্পর্শ
খারাপ রাজা বন্দী হল আগের মত সবাই শান্তি ফিরে পেল
মহারাজা আর মহারানীর ঘর আলো করে জন্ম নিলো রাজকন্যা ফুটফুটে রাজকন্যা খুশির বয়ে আনল সবার মনে
[সমাপ্ত]

পরিশেষঃএইটা আদৌ রূপকথা হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে ভুলভ্রান্তি নিজ গুনে ক্ষমা করবেন


[[২০১৪অগাস্ট৩১ঢাকা১১৪৯King.afk]]






নীল হিমুর প্রহর - পর্ব ০৮ - শেষ উপাখ্যান

বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে।
বৃষ্টির ছিটা আমার মুখে এসে লাগছে। আমার ঘুম ভেঙ্গেছে শীতল মেঘের জলের স্পর্শ্বে। 
হাল্কা শীত শীত করছে। খাটের উপর একটা কাথা থাকার কথা। সুন্দর ছবি আঁকা কাঁথার উপর। রুপা শখ করে বুনেছিল আমার জন্য। ইদানিং ঢাকার মেয়েরা ঢং আর নেকামি ছাড়া তেমন কিছু পারে না। রুপা অন্যরকম মেয়ে। যাই হোক আমি কাঁথাটা পাচ্ছি না। বালিশটাও নিখোঁজ। কাল রাতে চুরি হয়েছে। জানালা খোলা পেয়ে ঢুকে গেছে। ঘরের ভেতর কাথা আর বালিশ ছাড়া নেয়ার মত কিছু না পেয়ে সম্ভবত চোর হতাশ হয়েছে। 
ঘরের ভেতরে ইউরিয়ার গন্ধ। হতাশা থেকেই চোর এই কাজ করেছে।

বৃষ্টি কমেছে কিন্তু থামেনি। আমি নীল পাঞ্জাবী টা গায়ে জড়িয়ে বের হয়েছি। হালকা বৃষ্টির মধ্যে হাঁটছি। হঠাৎ একটা চিপা গলির মধ্যে থেকে একটা সূক্ষ্ণ সুর ভেসে আসছে বলে মনে হল। আমি গলিতে উঁকি দিলাম। কিছুটা সামনেই একটা চায়ের দোকান। গান সেখান থেকেই আসছে। খুব পরিচিত গান,
 হাওয়া মে উড়তা যায়ে, মেরা লাল দোপাট্টা মাল মাল কে, হো জি, হো জি 
আরে, বাকের ভাইয়ের গান দেখি। আমি দ্রুত পায়ে চায়ের দোকানে গেলাম। উঁকি মেরে দেখি বাকের ভাই চাইয়ের কাপে চুমুক দিচ্ছেন।
আমি বলে উঠলাম, বাকের ভাই, আমাকে চিনেছেন?
-কি রে হিমু কেমন আছিস?
- জি বাকের ভাই,ভালো। আপনার অবস্থা কি?
-এইতো ভালোই আছি। গান শুনছি।
আমাকে একটা এমপি থ্রি দেখালো।
-বুঝলি হিমু, জিনিসটা ভালো। মীরা কিনে দিয়েছে।
-বাহ, ভালোই তো।
- তা কই যাচ্ছিস তুই? দিনের বেলায় তো তোর বাইরে থাকার কথা না। তোর বের হয়ার সময় তো রাত। নিশিথের আধারে; হিমু যায় আহারে।
- ইদানিং রাতে কম বের হই। বয়স হয়ে যাচ্ছে।
- হাহাহা!!! তাই নাকি। তা তোর রুপার খবর কি?
- সে বৈদেশ। ডাক্তার স্বামীর ধরে চলে গেছে আরো এক যুগ আগে।
- অ আচ্ছা। ভালই করেছে। তোর সাথে থাকলে তো কাউকে মুখ পর্যন্ত দেখাতে পারতো না বেচারি। এখন তাও একটা পরিচয় আছে।
- তা ঠিক।

আমি চলে এলাম। বাকের ভাই একের পর এক চা খেয়েই যাচ্ছেন।
হাঁটতে হাঁটতে রমনার দিকে চলে এসেছি। এখন আর বৃষ্টি পড়ছে না।
আমি ভেজা রাস্তায় হাটছি। সবুজ গাছ দেখতে ভালো লাগছে। রাস্তায় খুব বেশি মানুষ নাই। বৃষ্টি বলে কপোত-কপোতিদের আসরও সেভাবে জমে নাই। আমি নিজ মনে হেটে যাচ্ছি। হঠাৎ একটা বাচ্চা মেয়ে আমার কাছে ছুটে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলো,

- Are you Himu?
- Yes
- Do you know Rupa?
- Yes
- I'm Puti. Her daughter.
- good

মেয়েটা আমার হাতে একটা কাগজের টুকরো গুজে দিয়ে দ্রুত চলে গেলো। কাগজের টুকরোতে কিছু লেখা আছে বলে মনে হচ্ছে। এখন পড়া ঠিক হবে না। চিঠি পড়ার কিছু নিয়ম কানুন আছে। পাঞ্জাবীর পকেট নাই বলে আমি কাগজের টুকরোটা হাতে মুড়ে নিয়েই হাঁটতে থাকলাম।

আচ্ছা, রুপা কি স্বপরিবারে দেশে এসেছে? তার ডাক্তার স্বামী কে নিয়ে সে তার কন্যাকে স্বদেশ ভ্রমণে এনেছে? কন্যা কি আমার কথা জানে? নাকি রুপা আমার সাথে যোগাযোগের জন্য তাকে ব্যবহার করছে?

আমি হাঁটতে হাঁটতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। যৌবনে অনেক হাঁটতে পারতাম। হিমু হবার অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। জানি না কতটা হতে পেরেছি।

আমি নীল হিমু নই। আমি কিংশুক। আমি চেয়েছিলাম হিমু হতে। পারি নি। আমি রুপার প্রেমে পড়েছিলাম।
আরো অনেক কিছুতে ব্যর্থ হয়েছি। আমি শেষ পর্যন্ত হিমু হতে পারি নি।

আজ থেকে নীল হিমুর প্রহর এর আর কোনো নতুন অধ্যায় লেখা হবে না।

নীল হিমুর অষ্ট প্রহর এর ইতি।

দিন শেষে আমরা সবাই হিমু হতে চাই।

[[সমাপ্ত]]


[[[কিংশুক২০১৫অক্টোবর১০শান্তিবাগ,ঢাকা১৬৪১]]]


নীল হিমুর প্রহর - পর্ব ০৭



আজ ঈদের আগের দিন।
বাজারে উপচে পড়া মানুষের ভীড়। শেষ মুহুর্তে মানুষের মনে পরেছে যে এটা ওটা কেনা এখনো বাকি। কিনতেই হবে। না কিনলে কালকে কোরবানী দেয়া অসম্ভব।
শপিং মলের আনাচে কানাচে তারুণ্যের জোয়ার। বেশির ভাগের উদ্দেশ্যই শপিং না। তারা এসেছে মজা করতে।
আমি রাত ৯ টা পর্যন্ত হেঁটে বেড়িয়েছি রাজপথে। একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম। রাত যত গভীর হচ্ছে রাস্তায় নারী সংখ্যা বেড়ে চলেছে আর পুরুষ কমছে। যুবকেরা যখন অনেক রাত হয়েছে বলে বাড়ি ফিরছে যুবতিরা তখন মাঠে নামছে। তবে তাদের বাইরেও একটা দল আছে যারা আগে পরে সবসময় যুগলবন্ধী। তাদের পৃথিবীতে প্রেরণের একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে যুগলবন্দী অবস্থায় যত্রতত্র বসে বসে মধুর মুহুর্তের সৃষ্টি করা।
আমি আমার ছোট কুঠরিতে ফিরছি। আজকে রাতে মানুষ ঘুমাবে না। তাই আজ আমার ঘুমানোর পালা।
একটা অন্ধকার চিপা গলির ভেতর ঢুকেছি। একটা একতলা বাড়ির বারান্দায় ১০০ ওয়াট এর হলদে বাল্ব জ্বালানো। এখন কেউ এরকম বাল্ব ব্যবহার করে না। সেই বাড়ীর পাশে রাস্তার দিকে একটা গাছ আছে। সুগন্ধ ছড়াচ্ছে। কি গাছ জানা গেলে ভালো হত। এই মুহূর্তে সুগন্ধী ফুলের গাছের নাম মনে করতে পারছি না। আমি গাছের নিকটবর্তি। গাছ তীব্র গন্ধে আমাকে প্রায় অর্ধমাতাল করে ফেলেছে। দূরে আবছা আলোয় আমি একজন মানুষ দেখলাম। সম্ভবত লাল শাড়ি পড়া। বাড়ির ভেতর থেকে একটা গান ভেসে আসছে। পুরনো গান। হেমন্ত বাবুর সম্ভবত।

“ আমি দূর হতে তোমারে দেখেছি
আর মুগ্ধ হয়ে চোখে চেয়ে থেকেছি
বাজে কিনি কিনি রিনিঝিনি
তোমারে যে চিনি চিনি
মনে মনে কত ছবি এঁকেছি”

হঠাৎ করে মনে হলো আমি মেয়েটিকে চিনি। মেয়েটা রুপা। কিন্তু রুপা আমাকে ছেড়ে চলে গেছে অনেক আগেই। সে তার সেলেব্রেটি স্বামীকে নিয়ে সুখে আছে। তার এখানে থাকার কথা না।
আমি ঘড়ির দিকে তাকালাম। রাত সাড়ে দশটা বাজে। সামনে ল্যম্পপোস্ট। একটা কুকুর ক্যু ক্যু শব্দ করে দৌড়ে চলে যাচ্ছে। আমার মনে হলো আমারো উচিত দ্রুত পায়ে এলাকা ত্যাগ করা।
আমি আমার ঘরে ফিরলাম রাত পৌনে ১২ টার দিকে। ঘামে ভেজা চপচপে পাঞ্জাবিটা খুলে রেখে খোলা জানার পাশে হেলান দিয়ে বসেছি। আমার হাতে অসম্ভব সুন্দর একটা জিনিস। জিনিসটা একজন বিশেষ মানুষ দিয়েছিলো বলেই সুন্দর। এমনিতে খুব সাধারন একটা জিনিস। কিন্তু আমার কাছে অসাধারন। একটা মোবাইল ফোন। সেখানে রুপার নাম্বার সেভ করা আছে। এই জিনিসটার জন্যেই আজ রুপা আমার কাছে নাই। অসম্ভব বড়লোক একজনকে বিয়ে করে সে দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছে। একদিক থেকে ভালই হয়েছে। মেয়েটা বেচে গেছে। কালকে ঈদ। ইচ্ছে করছে ফোন করে বলি, “কেমন আছো রুপা। আজকে ঈদ তাই উইশ করতে ফোন করেছি। তুমি কি বিরক্ত হয়েছো?”
ফোন করতে ভয় করছে। কিসের ভয়? হিমুদের তো ভয় থাকা যাবে না। তবুও ভয় করছে। তারচেয়ে বরং একটা এসএমএস পাঠানো যেতে পারে।
আমি লাল বাটনে চাপ দিয়ে আলো জ্বালালাম। দুইটা মিসড কল আর একটা এসএমএস।  
রুপা দুবার ফোন করেছিলো। না পেয়ে একটা এসএমএস পাঠিয়েছে। আমি এ জীবনে রুপার কল ধরতে পারলাম না। নিজের উপর খুব বিরক্ত লাগছে। এসএমএস এ হয়তো কিছু জরুরী কথা বলা আছে। কিন্তু চিঠি পাওয়া মাত্রই পড়তে হয় না। কয়েক সপ্তাহ ফেলে রাখতে হয়। তারপর পড়তে হয়। এতে চিঠি পড়ার একটা মজা আছে। অনেক জল্পনা কল্পনা মিশ্রিত চিঠি। এসএমএস এর ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য।
আমার উচিত এসএমএস না পড়ে ফেলে রাখা। কিন্তু খুব ইচ্ছে করছে রুপার এসএমএস টা পড়তে। আমার সাথে রুপার যোগাযোগ করার কোনোরূপ কারন নাই।
খুব কষ্ট হচ্ছে।  পুরানো স্মৃতিগুলো মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে। সেই সব মুহুর্তগুলো যখন সে আমার সাথে ছিলো।

হিমুদের দুঃখবোধ থাকতে নাই। হিমুরা সকল মানবীয় আবেগ এর উর্ধে। তবুও খুব কষ্ট হচ্ছে।

আমি তার জন্য পথ চেয়ে থেকেছি বহু নিশিত রজনি। তার একটা এসএমএস অথবা ফোন কল মিস করবো না বলে রাতের পর রাত জেগে থেকেছি নির্বাক যন্ত্রটিকে হাতে ধরে আর আজ সে যখন এসেছে আমি তখন নির্বাক।

আমি বোধয় হিমু হতে পারবো না কোনো দিনও। আমি আমার প্রিয় ফোনটা জানালা দিয়ে ফেলে দিলাম পচা নর্দমায়।
সে আমাকে কোনোদিন আর খুজে পাবে না। আর আমিও না।

তাকে আর বলা হলো না, “কেমন আছো রুপা। আজকে ঈদ তাই উইশ করতে ফোন করেছি। তুমি কি বিরক্ত হয়েছো?”

পৃথিবী খুব সুন্দর। সুন্দর পৃথিবী ঘুরিতেছে।

[[কিংশুক২০১৫সেপ্টেম্বর২৪সিরাজগঞ্জ২৩১৭]]



যাত্রা

মন ভাল  নেই

বৈরি আবহাওয়া যখন তখন মাথার উপর আকাশ ভেঙ্গে পরবে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে ভাজা রাস্তায় আমি হেটে যাচ্ছি ঢাকা শহরে বৃষ্টির পর হাটার আলাদা একটা মজা আছে চারপাশটা জীবন্ত লাগে অন্য সময় তো গাছপালা ধোঁয়া আর ধুলায় ঢাকা থাকে এই একটা কারনে হয়তো ঢাকা শহরের নাম টা সার্থক হয়েছে বলে মনে হয়

বৃষ্টির পর সবকিছু সজীবতাপূর্ণ, আরও জীবন্ত লাগার কারণ হয়তো খুব সবুজ গাছের পাতা গুলো মাঝে মাঝে এতটাই প্রানবন্ত লাগে যেন মনে হয় যে ওরা বুঝি আমার সাথে কথা বলছে

"এই কিংশুক একটু দাড়াও কথা বলবো কেমন আছো তুমি? কোথায় যাচ্ছো?"

নিজের মনেই উত্তর দেই প্রশ্নগুলোর আচ্ছা এমন কি কোন যন্ত্র আছে যেটা দিয়ে গাছেদের সাথে কথা বলা যাবে? গাছের ভাষা আমাদের ভাষায় আর আমাদের ভাষা তাদের ভাষায় রুপান্তর করে দিবে? পরিচিত কোনো বিজ্ঞানি থাকলে ভাল হত তাকে এই বিষয়ে জিগ্যেস করা যেত দুর্ভাগ্য, আমার পরিচিত এমন কেউ নাই যন্ত্র সম্ভবত নাই আমার ধারনা যে স্যার জগদীশ হয়ত এই জিনিশ নিয়েও ভাবেছে ভাবতে ভাবতে সেক্সট্যান্ট আবিষ্কার করেছে

যাই হোক আমি সবুজ পাতা দেখছি আর হেটে যাচ্ছি বিস্ময় ভরা চোখে প্রকৃতি দেখছি মুগ্ধ হচ্ছি

[ এই খানে একটা প্যরা ছিল বিশেষ কারনে দিলাম না তা না হলে আমার ভিডিও গেম খেলা বন্ধুরা অসন্তুষ্ট হতে পারে ]

হঠাৎ করে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করেছে শীতল বাতাস শীত করছে ব্যাগে একটা চাদর থাকার কথা নাও থাকতে পারে গরমকাল বের করে রাখা অস্বাভাবিক না ধোপাখানায়ও থাকতে পারে আবার ব্যাগেও থাকতে পারে ঠিক বুঝতে পারছি না ব্যাগ খুলে দেখা ছাড়া আর উপায় দেখছি না
ব্যাগে একটা চাদর আছে ঠিকই কিন্তু চাদরটা আমার না আমার ব্যাগে অন্যের চাদর থাকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে আপাতত চাদরটা দিয়ে শীত কমাতে পারলেই হলো তাই চাদরের মালিকানার প্রশ্ন মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে সুন্দর করে মুড়ে নিলাম নিজেকে চাদর মুড়ি দেয়ায় আমার চেহারার কবি ভাব আরও প্রকট হয়েছে

নীল পাঞ্জাবি সাদা পায়জামা আর দান কাঁধে ঝোলানো শান্তি নিকেতনি ব্যাগ মুখে দাড়ি মোছের জঙ্গল আর মাথা ভরতি বড় চুল চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আদতেই কবি বেশ ঢাকার অভিজাত রাস্তা দিয়ে হাটছি কিছুক্ষন আগে স্যান্ডেলটা ছিড়ে গেছে আশেপাশে মুচি পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না তাই পলিথিনে ভরে ব্যাগে রেখে দিয়েছি বড়লোকেদের জুতা ছিড়ে গেলে তারা কি করে? আমার মত নিশ্চয়ই মুচি খোঁজে না নতুন জুতা কিনে নেয় সাথে সাথেই? যদি দোকান না পাওয়া যায় তখন? ধুর ! কি রেখে কি ভাবছি বড়লোকেরা কি আর আমার মত রাস্তায় হাটে নাকি তারা তো বড় গাড়ী হাকিয়ে ঘুরে

শহরের ব্যাস্ত মানুষগুলো আসলেই খুব ব্যাস্ত নাকি ব্যাস্ততার ভান করে তা আমি বুঝতে পারি না খালি পায়ে কবি মুর্তি হেটে যাচ্ছে এরকম দৃশ্য তো কেউ শহরে হরহামেশাই দেখে না তবুও কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না শুধু অভাগা কিছু বাচ্চা রা, এই মুধুময় বৃষ্টিতেও রেইনকোট পরে বা ছাতা মাথায় মায়ের হাত ধরে স্কুলে যাচ্ছে, তারাই আমার দিকে বিরুপ দৃষ্টি দিচ্ছে আচ্ছা, ওদের আজকের টিফিন কি? ভুনা খিচুড়ি আর ডিম? নাকি বার্গার স্যান্ডুইস? কে জানে

আমি হেটে যাচ্ছি নিজের মত করেই মালিবাগ মোড়ে এককাপ চা খাওয়া যায় সাথে হালকা নাস্তা তারপর আবার যাত্রা শুরু করা হবে অনির্দিষ্টের দিকে যাত্রা এর ইতিবৃত্ত আমি আজ আর এঁকে দেব না ভাবছি রাত পর্যন্ত এভাবেই হেটে যাব আর ব্যাস্ত শহরের ব্যাস্ততা দেখবো
অজানার দিকে যাত্রার এক আলাদা আনন্দ আছে